
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) জানিয়েছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মোছাব্বিরকে হত্যার পরিকল্পনাকারী এবং অর্থ সরবরাহকারীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য তাদের কাছে আছে। তদন্ত সূত্রের খবর, মোছাব্বির হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল প্রায় সাড়ে চার মাস আগে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদেশ থেকে মোছাব্বির হত্যার জন্য ১৫ লাখ টাকা পাঠানো হয়। কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে বিদেশে থাকা এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
মোছাব্বির হত্যায় জড়িতদের ধরতে গত শনিবার ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ভৈরব ও কিশোরগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। গ্রেপ্তারদের মধ্যে আছেন মো. জিন্নাত (২৪), মো. বিল্লাল, আবদুল কাদির (২৮) ও মো. রিয়াজ (৩১)। ডিবি জানিয়েছে, মোছাব্বির ও সুফিয়ান ব্যাপারীকে গুলি করেছিলেন দুই ব্যক্তি। তাদের একজন মো. জিন্নাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আরেকজন আবদুর রহিমকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তার মো. বিল্লাল ও আবদুল কাদির হলেন পলাতক শুটার আবদুর রহিমের ভাই।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম আজ রোববার একটি সংবাদ সম্মেলনে চারজনের গ্রেপ্তারের তথ্য সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, ব্যবসাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের কারণে এই হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। হত্যাকাণ্ডের ভুক্তভোগী ছিলেন একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। প্রাথমিকভাবে আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো এখনও উদ্ধার করা যায়নি। তদন্তের মাধ্যমে হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য বের করা হবে।
রাজধানীর তেজগাঁও থানার পশ্চিম তেজতুরী বাজার এলাকায় গত বুধবার রাতে দুর্বৃত্তরা মোছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করে। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একের পর এক মামলার আসামি হয়ে বেশির ভাগ সময় কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তিনি আবার দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
হত্যাকাণ্ডের পর শুটাররা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অস্ত্র জমা রাখা, আশ্রয় নেওয়া এবং পালানোর চেষ্টা করেছিল—এমন একাধিক নতুন তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তদন্ত সূত্রের খবর, গুলি চালানোর পর জিন্নাত, আবদুর রহিম ও রিয়াজ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে মহাখালীর একটি মাঠে গিয়ে অস্ত্র জমা দেন। সেখানে পৌঁছে তারা তাঁদের নির্দেশদাতা জাহিদুলকে ফোনে গুলি করার ঘটনা জানায়।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ঘটনার পর আবদুর রহিমকে কিছু টাকা দিয়ে এলাকা ছেড়ে পালাতে বলেন তাঁর ভাই বিল্লাল। এরপর বিল্লাল ও জিন্নাত মহাখালী থেকে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের একটি আবাসিক হোটেলে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং সেখানে মাদক সেবনও করেন। পরে উত্তরা থেকে তিনটি নতুন মুঠোফোন কেনেন বিল্লাল, যার মধ্যে একটি ফোন জিন্নাতকে দিয়ে কক্সবাজারে পালানোর পরামর্শ দেন। তবে জিন্নাত কক্সবাজারে না গিয়ে গাজীপুরের গাছা এলাকায় নিজের বাড়িতে আশ্রয় নেন। রিয়াজও তাঁর সঙ্গে যান। সেখান থেকেই তাদের গ্রেপ্তার করে ডিবি।
·
হত্যাকাণ্ডের
পর আবদুল কাদির বিল্লালকে ১ লাখ ৮০
হাজার টাকা দেন। এই টাকার একটি
অংশ থেকেই বিল্লাল শুটার জিন্নাত ও আবদুর রহিমকে
প্রদান করেন।
·
একপর্যায়
জিন্নাতকে উত্তরার হোটেলে রেখে বিল্লাল মোটরসাইকেলে করে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় আত্মগোপন করেন। যাওয়ার আগে সাভারে তিনি নিজের মুঠোফোন বন্ধ করেন। সাটুরিয়া থেকে বিল্লালকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর
কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। এরপর মহাখালী এলাকা থেকে আবদুল কাদিরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
·
তদন্তে
পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাইরে অবস্থানরত এক শীর্ষ সন্ত্রাসী
এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী
লীগ সরকারের পতনের পর কারাগার থেকে
মুক্তি পান। কারওয়ান বাজার এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাড়ে চার মাস আগে মোছাব্বিরকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
·
ওই
শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে বিল্লাল ও জাহিদুলকে মোছাব্বিরকে
হত্যা করার জন্য ভাড়া করা হয়। এরপর বিল্লাল অন্যান্যদের ঠিক করেন এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।
· পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এর আগেও একবার মোছাব্বিরকে হত্যা করা চেষ্টা করা হয়েছিল। হত্যার কয়েক দিন আগে রিয়াজ তাঁর গতিবিধি নজরদারিতে রাখছিল। পরিকল্পনা বদলে পরে জিন্নাত ও আবদুর রহিমকে গুলি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, শুটার জিন্নাতকে তিন থেকে চার লাখ টাকা এবং একটি মোটরসাইকেল দেওয়ার কথা ছিল, আর সমন্বয়কারী বিল্লালকে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা নগদ এবং পরবর্তী মামলার সব খরচ দেওয়া হবে।